
বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা আর কনফার্মড টিকিট—উড়োজাহাজে চড়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সবই ছিল যাত্রীদের কাছে। তবুও মেলেনি স্বস্তি।
একের পর এক অযৌক্তিক অজুহাতে আটকে রাখা হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উদ্দেশ্য একটাই—হয়রানি করে পকেট কাটা। শেষ পর্যন্ত ‘সমস্যা সমাধানের’ নামে খসাতে হয়েছে মোটা অঙ্কের টাকা।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্যাসেঞ্জার ও গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ যাত্রীরা। সিভিল এভিয়েশন ও বিমানের ভেতরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে এই ভয়ংকর জিম্মিদশা। মাসব্যাপী অনুসদ্ধানে উঠে এসেছে তাদের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
যেভাবে চলে এই সিন্ডিকেটের ‘টাকা বানানোর খেলা’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও অর্থ লোপাটের জন্য মূলত কয়েকটি ফাঁদ ব্যবহার করে এই চক্র:
-
ওজন কারচুপি ও জালিয়াতি: অতিরিক্ত ব্যাগেজের ভুয়া হিসাব দেখিয়ে বা অন্য যাত্রীর ব্যাগেজ কোটায় অবৈধভাবে ব্যাগ যুক্ত করে নগদ অর্থ পকেটে পোরা।
-
বোর্ডিং পাশ বাণিজ্য: পিসিইউ (পাসপোর্ট চেকিং ইউনিট) থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও কাউন্টারে জিম্মি করে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া।
-
আসন আপগ্রেড অনিয়ম: মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে ইকোনমি ক্লাসের টিকিটধারী যাত্রীদের বিজনেস ক্লাসে আপগ্রেড দেওয়া (বিশেষ করে টরন্টো ও হজ ফ্লাইটগুলোতে)।
থোকা থোকা অনিয়ম: অনুসন্ধানে ধরা পড়া কয়েকটি ঘটনা
-
১৮ আগস্ট (বিজি-৩০৫ ফ্লাইট): মাহমুদ সারওয়ার নামে এক যাত্রীর অতিরিক্ত দুটি লাগেজ বুকিংয়ের জন্য কাউন্টার হেলপার ইব্রাহিম ৫২ হাজার টাকা নেন, কিন্তু কোনো মানি রিসিট দেননি। উল্টো জিএসএ বুরহান ও মিজানুর রহমান ফিরোজ ওই ব্যাগ দুটি অন্য চারজন অচেনা যাত্রীর কোটায় ট্যাগ করে দেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে যাত্রী চিৎকার শুরু করলে ধরা পড়ে জালিয়াতি। পরবর্তীতে ধরা পড়ার ভয়ে ইব্রাহিম টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং তড়িঘড়ি করে ভুয়া রসিদ ইস্যু করা হয়।
-
২১ জুলাই (বিজি-৩২৭ আবুধাবি-পর্তুগাল ফ্লাইট): পিসিইউ থেকে সবুজ সংকেত পাওয়ার পরও ৯ জন বৈধ যাত্রীকে কাউন্টারে আটকে রাখেন দায়িত্বরত সুপারভাইজার। প্রতি জনের কাছে চাওয়া হয় ১৫ হাজার টাকা। প্রায় ২ ঘণ্টা জিম্মি রাখার পর এজেন্সির মাধ্যমে টাকা পেয়ে তবেই মেলে বোর্ডিং পাশ।
-
সিঙ্গাপুর ফ্লাইট জালিয়াতি: জিএসএ বুরহান এক যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যাগেজ ফি বাবদ ৫ হাজার টাকা নিয়ে সরাসরি নিজের পকেটে পুরেন। যাত্রী বোর্ডিং গেটে লিখিত অভিযোগ করলে এক কাউন্টার সুপারভাইজার দ্রুত সিস্টেম এডিট করে টাকাটি রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দেখিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেন।
সিন্ডিকেটের মূল খোলস
তদন্তে এই চক্রের পেছনে একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। নাম উঠে এসেছে:
-
জিএসএস মো. জসিম উদ্দিন (আইডি: জি-৫২১৯৫)
-
জিএসএ মোহাম্মাদ বুরহান উদ্দিন (আইডি: জি-৫৩০৪৭)
-
জিএসএ মিজানুর রহমান ফিরোজ (আইডি: জি-৫৩০৩০)
-
এছাড়া একাধিক কাউন্টার সুপারভাইজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ও বহিরাগত হেলপার ইব্রাহিম এই প্রক্রিয়ায় জড়িত।
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কাজী ওয়াহিদুল আলম (এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ):
“বিমানবন্দরে যাত্রীসেবা কোনো অর্থ উপার্জনের বা চাঁদা আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। বৈধ কাগজ থাকার পরও যাত্রীদের আটকে রাখা মারাত্মক অপরাধ। দ্রুত সিজিটিভি ফুটেজ, সিস্টেম লগ ও ব্যাগেজ ট্যাগ পরীক্ষা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
বদরুল হাসান লিটন (পরিচালক, গ্রাহকসেবা বিভাগ, বিমান):
“যাত্রী হয়রানির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ—জিরো টলারেন্স। বিষয়টি ইতোমধ্যে এয়ারপোর্ট সার্ভিস বিভাগকে খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। তদন্তে সত্যতা মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
বিমানের মতো জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থায় এমন সিন্ডিকেটের উপস্থিতি শুধু যাত্রীদের পকেটই কাটছে না, বরং বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারকে বঞ্চিত করছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে। এখন দেখার বিষয়, অভ্যন্তরীণ তদন্তের নামে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে নাকি সত্যি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অনলাইন ডেস্ক 






















