
মেট্রোরেলের দুই মেগা প্রকল্পে বড় ধরনের ব্যয় বাড়াল সরকার। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) আগের নির্ধারিত ব্যয়ে রাজি না হওয়া এবং সুদহার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রকল্প দুটির ব্যয় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (উত্তর) প্রকল্পের সংশোধনী পাস হয়। এর ফলে প্রকল্প দুটির মোট ব্যয় ৯৩,৭৯৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২,০৪,২৪২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রকল্পভিত্তিক ব্যয় ও মেয়াদের চিত্র
-
এমআরটি-১ (বিমানবন্দর-পূর্বাচল-কমলাপুর): ৩১.২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রকল্পের আগের ব্যয় ছিল ৫২,৫৬১ কোটি টাকা। ৬১,৮৩৩ কোটি টাকা বৃদ্ধিতে নতুন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১,১৪,৩৯৪ কোটি টাকা। এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকেও ছাড়িয়ে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্পে পরিণত হলো। চালুর মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০ ৩৩ সালের ডিসেম্বর।
-
এমআরটি-৫ উত্তর (আমিনবাজার-ভাটারা): ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রকল্পে ৪৮,৬১০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। ফলে এর মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮৯,৮৪৮ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
-
এমআরটি-৫ দক্ষিণ (গাবতলী-দাশেরকান্দি): একই সভায় ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫,৫০৩ কোটি টাকা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে ২০ ৩৩ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
জাইকার শর্ত, একক আধিপত্য ও সুদহার
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ঋণদাতা সংস্থা জাইকার নির্দিষ্ট কিছু শর্তের কারণে মূলত দরপত্রে কেবল জাপানি ঠিকাদাররাই অংশ নিতে পারে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ না থাকায় কাজের প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি দাম হাঁকায় ঠিকাদারেরা। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এ কারণে প্রকল্পটি স্থগিত করে বিকল্প অর্থায়নের চেষ্টা করলেও বর্তমান বিএনপি সরকার জাপানের ঋণের শর্তেই কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২০ সালে জাইকার ঋণের সুদ ছিল ০.০৭%, যা বেড়ে বর্তমানে ৩.০৬% হয়েছে এবং আগামী মাসে ৩.৫% হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুদ আরও বাড়ার আগেই তড়িঘড়ি করে একনেকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি।
ভর্তুকি ও নির্মাণের মান নিয়ে সংশয়
বর্তমানে চালুকৃত এমআরটি-৬ লাইনে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, অথচ ঋণের কিস্তি বাবদ পরিশোধ করতে হয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচের জন্য সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। নতুন দুই প্রকল্পের আকাশচুম্বী ব্যয়ের কারণে ভবিষ্যতেও ভারী ভর্তুকির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এছাড়া, জাপানি প্রতিষ্ঠানের নির্মিত এমআরটি-৬ লাইনের ৪৬টি পিলারে ফাটল ও ২৭টি বিয়ারিং প্যাডে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, ত্রুটির বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দায়ীদের জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা হবে।
একনেকের ঐতিহাসিক রেকর্ড
গতকাল একনেক সভায় মেট্রোরেলের ৩টি সহ মোট ১২টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়, যার সমন্বিত ব্যয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এটি একক একনেক সভায় সর্বোচ্চ ব্যয় অনুমোদনের নতুন রেকর্ড। সভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অন্যান্য মন্ত্রী ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনলাইন ডেস্ক 























