
যানজট কমিয়ে আধুনিক ও দ্রুতগতির গণপরিবহন চালুর সুদূর প্রসারী স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। কিন্তু দীর্ঘ ১৪ বছরের নানা জটিলতা, সীমাহীন জনভোগান্তি এবং কয়েক দফা ব্যয় বৃদ্ধির পর অবশেষে গত ১৮ অক্টোবর প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে প্রায় ৯৭ শতাংশ অবকাঠামো কাজ শেষ হওয়ার পরও আলোর মুখ দেখল না বহু আকাঙ্ক্ষিত এই বাস সেবা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরটি প্রকল্পের শুরু থেকেই ছিল পরিকল্পনাগত বড় ধরনের ত্রুটি। পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা চূড়ান্ত না করেই কাজটি শুরু করায় বিভিন্ন সেবা সংস্থার সাথে সমন্বয়হীনতা, গ্যাস-বিদ্যুতের লাইন সরাতে জটিলতা এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে।
এছাড়া প্রকল্পটির অন্যতম বড় ব্যর্থতা ছিল নির্দিষ্ট ও উপযোগী বাস সংগ্রহ করতে না পারা। বিশ্বমানের এই প্রকল্পে ডানপাশে দরজা সংবলিত বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। ফলে গাজীপুর বা উত্তরের জেলাগুলোর যাত্রীদের বিমানবন্দরে এসে বাস বদল করে গন্তব্যে যেতে হতো, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য ছিল সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভোগান্তির।
তিন দফায় সংশোধনের মাধ্যমে এই প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ১০৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হলেও যাত্রী পরিবহনের সেবাটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন বিআরটির অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। এর জন্য ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক সরাতে ব্যয় হবে অতিরিক্ত ৪৫ কোটি টাকা এবং সড়ক প্রশস্তকরণে আরও লাগবে ২৭ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি বাতিলের নেপথ্যে কাজ করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক বিশেষজ্ঞ দল। দলটির প্রধান অধ্যাপক ড. সামছুল হক একে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনায় ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতা’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে থাকা রোগীর মতো এই প্রকল্পটিকে টেনে না নিয়ে বাতিল করাই ছিল সবচেয়ে ভালো ও বাস্তবসম্মত বিকল্প।
অন্যদিকে, ভিন্নমত পোষণ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান এই সিদ্ধান্তকে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য একটি ‘কালো দিন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, প্রকল্পটি বাতিল না করে ত্রুটি সংশোধন করে চালু করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে জনবান্ধব হতে পারত।
১৪ বছরের দীর্ঘ জট আর হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অপচয়ের পর বিআরটি প্রকল্পের এই করুণ পরিণতি দেশের ভবিষ্যৎ বড় infrastructural প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাই আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল।
অনলাইন ডেস্ক 























