
উত্তরের সীমান্ত জেলা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণের পর্যটননগরী কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালুর পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বড় রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করতে পাঁচটি অগ্রাধিকার প্রকল্পসহ বহুমুখী আধুনিকায়ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার।
দূরত্ব ও সময় সাশ্রয়: বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলো ঢাকাগামী যাত্রায় ঈশ্বরদী হয়ে ঘুরে যাওয়ায় অনেক সময় নষ্ট হয়। প্রস্তাবিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ কর্ড লাইন ও শান্তাহার-বগুড়া লিংক বাস্তবায়িত হলে এই ঘুরপথ প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে। এতে পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও চিলাহাটিসহ পুরো অঞ্চলের যাত্রীদের ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় বাঁচবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে।
পূর্বাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন: পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইনের সুসমন্বয় ঘটাতে চট্টগ্রাম-দোহাজারী, টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ এগিয়ে চলছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ইতোমধ্যে ডুয়েলগেজ হওয়ায় এই সংযোগটি পুরো পথকে সরাসরি চালুর উপযুক্ত করে তুলবে।
মহানগর এক্সপ্রেস এখন কক্সবাজারে: ২৬ অক্টোবর থেকে জনপ্রিয় মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটির রুট ঢাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত করা হয়েছে। এর ফলে নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা ও ফেনীর যাত্রীরাও এখন খুব সহজে সরাসরি কক্সবাজার যাতায়াত করতে পারবেন।
নতুন কমিউটার ও আন্তঃনগর ট্রেন: সম্প্রতি ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন চালুর পর, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারত থেকে আমদানিকৃত নতুন ব্রডগেজ কোচ দিয়ে ঢাকা-পাবনা রুটে একটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া ঢাকা-খুলনা রুটেও দুটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
রাজধানীর সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ আরও সহজ করতে প্রায় ৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-কুমিল্লা কর্ড লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পুরো অংশটি উড়ালপথে (এলিভেটেড) নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার এবং যাতায়াতের সময় দুই ঘণ্টা কমে যাবে।
কোচ ও লোকোমোটিভ সংগ্রহ: ভারত ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের (যেমন: এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক এবং এডিবি) অর্থায়নে শত শত নতুন ব্রডগেজ ও মিটারগেজ কোচ, ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং রিলিফ ক্রেন সংগ্রহের কাজ চলছে।
ডিজিটাল সেবা ও ওয়াই-ফাই: যাত্রীদের ডিজিটাল সুবিধা নিশ্চিত করতে কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রেলস্টেশনের পাশাপাশি পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, বনলতা ও উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই (স্টারলিংক ও বিটিসিএল) সেবা চালু করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ও আধুনিকায়ন: রেলক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা কমাতে বুয়েটের সহযোগিতায় আন্ডারপাস, ওভারপাস ও স্বয়ংক্রিয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক আন্ডার-ফ্লোর হুইল লেদ মেশিন চালুর মাধ্যমে এখন চাকা না খুলেই ট্রেনের চাকার রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হবে।
সার্বিকভাবে, এই বহুমুখী উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রেলওয়ে আরও আধুনিক, নিরাপদ, দ্রুতগতির এবং জনবান্ধব একটি যোগাযোগ মাধ্যমে রূপান্তরিত হবে।
অনলাইন ডেস্ক 























