
মেধাবী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সুতিকাগার নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর উপজেলা। পাহাড়ঘেঁষা মেঘালয়ের পাদদেশের এই জনপদে বাঙালি ছাড়াও গারো, হাজং, কুচ, বানাই, হৃদি ও ঢালু সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী টংক আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ—ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে এই নৃ-গোষ্ঠীর গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। তবে সময়ের পরিক্রমা ও চর্চার অভাবে আজ তাদের নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গারো ও হাজং ভাষার প্রচলন কিছুটা টিকে থাকলেও অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার লিখিত রূপ, বর্ণমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের ব্যবস্থা না থাকায় তারা হুমকির মুখে পড়েছে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অবহেলিত ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি। একসময় প্রতিষ্ঠানটি নাচ, গান ও সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই জনপদের ঐতিহ্য তুলে ধরলেও নানামুখী সংকটে এর কার্যক্রমে ভাটা পড়ে। বর্তমানে একাডেমির ১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ৪ জন কর্মী দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এর কার্যক্রম। এর সঙ্গে ২৪ জন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিল্পী ও শিক্ষার্থী যুক্ত রয়েছেন।
তবে সম্প্রতি একাডেমিটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এর পরিচালক অঞ্জন কুমার চিছাম। তিনি জানান, জনবল সংকট দূর করার পাশাপাশি ভাষা চর্চার জন্য সংরক্ষিত পাণ্ডুলিপিগুলো সংরক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডেপুটি স্পিকারের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে নতুন গতি আসছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে একাডেমির শিক্ষক মালা মার্থা আরেং মনে করেন, ভাষা ও সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এর জন্য তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং প্রতিনিয়ত ভাষা চর্চার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
হাজং ভাষা সংরক্ষণে সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। তার নিজস্ব প্রচেষ্টায় হাজং ভাষার বর্ণমালার বই ‘মুলা হাজং’-এর দুই হাজার কপি ছাপিয়ে দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন মন্দিরে বিতরণ করা হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আগামীতে মন্দিরভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল সাময়িক উদ্যোগ নয়, বরং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়ে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমির কার্যক্রম পুরোপুরি সচল করা গেলেই কেবল দুর্গাপুরের এই সমৃদ্ধ বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।
অনলাইন ডেস্ক 






















