
ইউক্রেন সংঘাত অবসানে দৃশ্যমান বড় কোনো অগ্রগতি না ঘটলেও, কূটনৈতিক ময়দানে কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটছে। গত ২৭ অক্টোবর ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গার স্টোরের পক্ষ থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দেওয়া একটি যৌথ ফোনকলকে এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নর্ডিক এই দুই শীর্ষ নেতা স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের এই উদ্যোগ ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নয়, বরং রাশিয়ার সরাসরি প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে নেওয়া হয়েছে। মূলত গত ২০ অক্টোবর অসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিফেন উইটকফের সঙ্গে তাদের একান্ত বৈঠকের পরই এই কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছে। কিয়েভকে নরওয়ে ১৭ বিলিয়ন এবং ফিনল্যান্ড ৫ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দিলেও, শান্তি আলোচনায় তাদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে ইউক্রেনের কট্টর সমর্থকরাও এখন সংলাপের পক্ষে নিজেদের অবস্থান নমনীয় করছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২১ অক্টোবর মার্কিন দূত স্টিফেন উইটকফ অসলো থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গে গিয়ে ইউক্রেন সংকটের নতুন প্রস্তাব তুলে ধরেন। এর ফলশ্রুতিতে খুব শীঘ্রই যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হতে যাচ্ছে, যা নভেম্বরের শুরুতে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতারা পুতিনের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে পুরো বিষয়টি অবহিত করেছেন এবং তিনি তাঁদের এই জোরালো প্রচেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন কড়া অবস্থান বজায় রাখলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নীতিতে পরিবর্তন আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময় এটি। বিশেষ করে, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় খেরসনের ওলেশকি শহরে স্থানীয় মানবিক যুদ্ধবিরতি এবং ক্রেমলিনের সঙ্গে তাঁর কার্যকর সম্পর্কের বিষয়টি এই প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। ক্রেমলিনও এই মডেলটিকে অন্যান্য সংঘাত অঞ্চলেও প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে।
পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার ডিজেল চুক্তির পর এবার অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে। গুঞ্জন রয়েছে, ট্রাম্প রুশ অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের প্রধান মাধ্যম ‘রাশিয়ান ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। এছাড়া মার্কিন কৃষকদের স্বার্থে রুশ সার আমদানির পরিকল্পনা এবং লিন্ডসে গ্রাহাম আইন নিষ্ক্রিয় রাখার মতো পদক্ষেপগুলো রুশ পক্ষকে আলোচনায় নমনীয় করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল বলেই মনে হচ্ছে।
নর্ডিক নেতাদের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে পুতিন মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:
১. নভেম্বরের আবুধাবি বৈঠকে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি সাপেক্ষে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।
২. রাশিয়ার স্বার্থ পুরোপুরি এবং শর্তহীনভাবে বিবেচনা করা না হলে কোনো স্থায়ী শান্তি আসবে না।
৩. ইইউ ও ন্যাটোর সংঘাতমূলক নীতি এই সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
নভেম্বরের এই আসন্ন ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হয়তো একবারে ইউক্রেন যুদ্ধের পুরোপুরি অবসান ঘটাতে পারবে না। ইউরোপীয় শক্তিগুলোও নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে যতটা ব্যস্ত, বাস্তবসম্মত দায়িত্ব নিতে ততটা আগ্রহী নয়—এমন সমালোচনাও রয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে যুদ্ধবিরতির এই নতুন উদ্যোগ বিশ্ববাসীকে কিছুটা হলেও আশাবাদী করে তুলেছে।
অনলাইন ডেস্ক 























