
ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং বেইলি রোডের ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় বিতর্কিত ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনের নকশা অনুমোদনের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকার পরও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বহাল রয়েছেন মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের টপকে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) পদ বাগিয়ে নেন। পদে বসেই নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে অধিদপ্তরকে অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বদলি বাণিজ্য ও লটারিতে কারসাজি
স্বচ্ছতা আনার দোহাই দিয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে লটারির মাধ্যমে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলি করা হলেও, বাস্তবে এটি কোটি কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যে রূপ নিয়েছে।
-
বাক্সে পছন্দের নাম: অভিযোগ রয়েছে, লটারির আগেই ঢাকার নির্দিষ্ট বাক্সে পছন্দের ও তদবির করা প্রার্থীদের নাম ঢুকিয়ে রাখা হয়।
-
স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য: লটারির নিয়ম উপেক্ষা করে অনেককে নিজ জেলায় স্বপদে রাখা বা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখার পেছনে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে বদলি হওয়া অনেক প্রকৌশলীকে কয়েক মাসের মাথায় আবারও অহেতুক বদলি করা হয়েছে।
-
নিয়মবহির্ভূত ছাড়: সাতজন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে কোনো লটারির আওতাই আনা হয়নি। ময়মনসিংহ অঞ্চলের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও কৌশল করে ঢাকার বাক্সে নাম স্থানান্তর করে সুবিধাজনক পদে পদায়ন বাগানোর ভুরি ভুরি উদাহরণ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য ফান্ডের নামে চাঁদা ও সিন্ডিকেটের প্রভাব
সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, সদ্য বদলিকৃত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ উঠেছে:
-
ফান্ড সংগ্রহ: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ আনাতো বটেই, এমনকি নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর অজুহাতেও মোটা অঙ্কের ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে।
-
একতরফা ক্ষমতা: নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলী নির্বাহী প্রকৌশলী পর্যন্ত বদলি করতে পারেন। তবে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের ওপর লটারি চাপিয়ে দিলেও নিজের ক্ষমতা বজায় রাখতে নির্বাহী প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার অজুহাতে লটারি বাতিল রাখতে চান তিনি।
-
ভুয়া বিল ও দুর্নীতি ঢাকা: একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে কাজ ছাড়াই অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, নারীঘটিত কেলেঙ্কারি এবং সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনের পেছনেও কাজ করছে এই সিন্ডিকেট।
সহকর্মীদের ফাসাতে ‘সাজানো মামলা’ ও ভুয়া সনদ জালিয়াতি
প্রধান প্রকৌশলীর পদ পাকাপোক্ত করতে তিনি চরম পথ বেছে নিয়েছেন বলে অভিযোগ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের।
-
সাজানো মামলা: সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা নিজের চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের প্রতিযোগী মনে করে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার রামপুরা থানার এক হত্যা মামলায় ৪৭ জন প্রকৌশলীকে কৌশলে আসামি করা হয়। পরে সেই মামলার নথি এসএসবি ও সংশ্লিষ্টদের গ্রামে পাঠিয়ে তাঁদের স্থায়ীভাবে দৌড় থেকে ছিটকে ফেলার চক্রান্ত করা হয়।
-
অস্ট্রেলিয়া প্রবাস ও শাস্তি মওকুফ: চাকরিজীবনের প্রায় ১১ বছর প্রেষণ ও ছুটির অজুহাতে অস্ট্রেলিয়ায় কাটিয়েছেন তিনি। ভুয়া পিএইচডি সনদের জন্য বিভাগীয় মামলায় অপরাধ প্রমাণিত হলেও সাবেক আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি পার পেয়ে যান এবং এক বছরে দুই বার পদোন্নতি পান। ৫ আগস্টের পর দ্রুত ভোল পাল্টে নিজেকে জামায়াতপন্থি হিসেবে জাহির করে প্রশাসনিক দায়িত্ব নেন।
গ্রিন কোজি কটেজের দায় ও সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি
২০২৪ সালে বেইলি রোডের ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটানো ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ ভবনের জরুরি সিঁড়িশূন্য নকশা ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার হিসেবে অনুমোদন দিয়েছিলেন এই খালেকুজ্জামান চৌধুরী। তদন্ত প্রতিবেদনে নাম কাটানোর তদবিরের পাশাপাশি নিজের অপরাধের সাম্রাজ্য আড়াল করতে বর্তমানে পূর্ত ভবনে সাংবাদিকদের প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করেছেন তিনি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী দাবি করেন, লটারিতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়ন মেধার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁর কোনো প্রতিযোগী নেই।
অন্যদিকে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, বদলিতে অনিয়মের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জ্যেষ্ঠতা বজায় রেখে গ্রেড-১ পদে পদায়নের বিষয়টি বর্তমানে এসএসবিতে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
অনলাইন ডেস্ক 

























