
চট্টগ্রাম বনাঞ্চলের আওতাধীন বান্দরবানের লামা বন বিভাগ যেন দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে অবাধে চলছে গাছ কাটা, বনভূমি দখল এবং কোটি টাকার অর্থ বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে অধীনস্থ একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সিন্ডিকেট গড়ে তুলে বনাঞ্চল উজাড়ে মেতে উঠেছেন। একই সঙ্গে অভিনব কায়দায় পাল্টে ফেলা হচ্ছে বনের নাম ও মানচিত্র। অসাধু কর্মকর্তাদের এমন বেপরোয়া লুটপাটে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
অর্থের বিনিময়ে পদায়ন ও বহুমাত্রিক সুবিধা
অনুসন্ধানে জানা যায়, অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের পদে বসানো হচ্ছে কর্মকর্তাদের। অভিযোগ রয়েছে, ফরেস্টার রনি পারভেজকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে লামা বন আদালতের এফসিসিও, বমুবিলছড়ি বিট, বিশেষ টহল দল, লামা রেঞ্জ এবং লামামুখ চেকস্টেশনের মতো পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, আব্দুল মালেক নামে এক রেঞ্জারকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্ব প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। এক ব্যক্তির হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকায় কাঠ পাচারকারীদের পথ সুগম হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ইটভাটা ও বনায়নে জালিয়াতির অভিযোগ
সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ কাটা ও ইটভাটায় লাকড়ি পোড়ানোর সুযোগ দিতে ডিএফও বিপুল অংকের ঘুষ নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অঞ্চলটির অন্তত ৪০টি ইটভাটা থেকে এককালীন ৫ লাখ এবং প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। টাকা না দিলে চলে অভিযান ও মালামাল জব্দের ভয়ভীতি। এছাড়া, ৮০ হেক্টর জমি বনায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে মাত্র ৩০ হেক্টরে বাগান করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৫০ হেক্টরের সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
টিপি জালিয়াতি ও বাঁশ-কাঠের বাজার
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বর্ষা মৌসুমে মোটা অংকের টাকা বিনিময়ে কাঁচা বাঁশ বহনের পরিবহন পাশ (টিপি) দেওয়া হচ্ছে, যেখানে প্রতি বাঁশে ৫ টাকা করে পান ডিএফও। মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনের বাঁশ বন্ধ থাকলেও রাতে ভুয়া টিপিতে লাখ লাখ টাকার বাঁশ পাচার হচ্ছে।
এছাড়া, ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোত থেকে সেগুন ও গামারীসহ ২,৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদনের আড়ালে প্রায় ৪৮টি টিপি ব্যবহার করে অগণিত গাছ পাচার করা হয়েছে।
পর্দার আড়ালের ‘ক্যাশিয়ার’ ও সিন্ডিকেট
অভিযোগ রয়েছে, ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন এবং ফরেস্টার রনি পারভেজ ডিএফওর ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করছেন। ফাইতং সড়কটি কাঁচা কাঠ পাচারকারীদের কাছে একপ্রকার লিজ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, গত ১০ বছর ধরে টিপি (চলন পাশ) শাখায় কোনো সরকারি কর্মকর্তা না রেখে মো. সেলিম নামের একজন বেসরকারী ব্যক্তিকে রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে আড়াই শতাধিক টিপি থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করে ডিএফওর হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
উর্ধ্বতন মহলের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, বদলি-বাণিজ্য এবং সরকারি আউটসোর্সিংয়ের ছয়জন কর্মচারীকে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে নীরব চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে। স্থানীয়দের দাবি, তার এই নিষ্ক্রিয়তা ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নিতে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সিএফ মিহির কুমার দে নেটওয়ার্কের সমস্যা অজুহাত দেখিয়ে কল কেটে দেন।
বন-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ মহলের মতে, সরকারি সম্পদ রক্ষা ও বনাঞ্চলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দ্রুত এসব নথি, টিপি রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি।
অনলাইন ডেস্ক 

























