
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়া এবং মোট ব্যবহারের ৭০ শতাংশের বেশি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতার এমন এক সংকটময় মুহূর্তে যুক্তরাজ্যের আলোচিত ৮৭০ কোটি পাউন্ডের রোজব্যাঙ্ক তেলক্ষেত্র নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ। শেটল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এই বিশাল প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মন্ত্রিসভা এখন আক্ষরিক অর্থেই দুই ভাগে বিভক্ত।
একদিকে চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস এবং বিজনেস সেক্রেটারি জোনাথন রেনল্ডস কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয়ের স্বার্থে এই খনির দ্রুত অনুমোদন চাইছেন। দেশের প্রভাবশালী শ্রমিক ইউনিয়ন ‘ইউনাইট’ ও ‘জিএমবি’ও একই দাবি তুলেছে। এছাড়া প্রকল্পের এক-পঞ্চমাংশের মালিক ইতাকা এনার্জি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, সরকার অনুমোদন না দিলে তারা ব্রিটেনে সব ধরনের বিনিয়োগ বন্ধ করে দেবে। মেল অন সানডে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক মন্ত্রী জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এই প্রকল্পটির পক্ষেই সায় দিতে পারেন।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের মূল দায়িত্বে থাকা পরিবেশমন্ত্রী মিয়াত্টা ফাহনবুল্লে এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এর কঠোর বিরোধিতা করছেন। ফাহনবুল্লের মতে, নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিতে অর্থায়ন করা সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে নতুন কোনো তেল-গ্যাস ক্ষেত্র তৈরি করা উচিত নয়। এর আগে গত ২১ অক্টোবর তিনি ‘জ্যাকড’ নামের অন্য একটি গ্যাসক্ষেত্রের অনুমোদন দিলেও যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, জ্যাকড অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাবে আর রোজব্যাঙ্ক মূলত রপ্তানির উদ্দেশ্যে তৈরি। তাছাড়া, আইনি মারপ্যাঁচ ও পরিবেশগত মূল্যায়নে ত্রুটির কারণে গত ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে স্কটল্যান্ডের কোর্ট অব সেশন এই খনিগুলোর প্রাথমিক অনুমোদন বাতিল করেছিল।
রাইস্ট্যাড এনার্জির তথ্যমতে, নর্থ আটলান্টিকের শেটল্যান্ড থেকে প্রায় ৮০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত রোজব্যাঙ্কে প্রায় ৫০ কোটি ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ জ্বালানি রয়েছে (যার ৯০ শতাংশই তেল)। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দৈনিক প্রায় ৬৯ হাজার ব্যারেল তেল উত্তোলন করা যাবে, যা যুক্তরাজ্যের সম্ভাব্য মোট উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ।
পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এই তেল ব্যবহার করলে ২০ কোটি টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গত হবে, যা জ্যাকড খনির তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি। তবে প্রকল্পের যৌথ প্রয়াস ‘অ্যাডুরা’ (ইকুয়িনোর ও শেল পিএলসি) দাবি করেছে, তারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতি ব্যারেলে কার্বন নির্গমন ১২ কেজিতে নামিয়ে আনবে, যা উত্তর সাগরের গড় নির্গমনের চেয়ে বেশ কম। এই তেল সরাসরি শাটল ট্যাঙ্কারে করে ইউরোপের শোধনাগারগুলোতে পাঠানো হবে।
বর্তমানে উত্তর সাগরে তেলের উৎপাদন দ্রুত কমছে। নর্থ সি ট্রানজিশন অথরিটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে দেশটির তেলের মজুদ কমে ২৫০ কোটি ব্যারেলে ঠেকেছে এবং সে বছর কোনো নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়নি। এর বিপরীতে, প্রায় প্রস্তুত থাকা ‘জ্যাকড’ গ্যাসক্ষেত্রটি তাদের জাতীয় চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ করবে।
এদিকে জ্যাকড খনির অনুমোদনের সাথে সাথে ট্রেজারি উত্তর সাগরের তেল ও গ্যাস থেকে আসা আয় দিয়ে ২ কোটি পাউন্ডের একটি নতুন ‘এনার্জি ওয়েলথ ফান্ড’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। ট্রেজারির মতে, ব্রিটেন যদি ১৯৮০-এর দশক থেকে নরওয়ের মতো তাদের আয় বিনিয়োগ করত, তবে আজ সেই ফান্ডের পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন পাউন্ড হতো। উল্লেখ্য, তেল খাতের উদ্বৃত্ত রাজস্ব থেকে গড়ে ওঠা নরওয়ের সার্বভৌম ফান্ডটি বর্তমানে প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম ফান্ড হিসেবে পরিচিত।
অনলাইন ডেস্ক 
























