
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলেও ক্ষমতার ভোল পাল্টে বহাল তবিয়তে বহাল আছেন বহু বিতর্কিত কর্মকর্তা। রাজনৈতিক প্রভাব, তদবির আর আঞ্চলিক পরিচয়ের জোরে পার পেয়ে যাওয়া এমন একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার নাম শেখ জিকরুল আলম, যিনি বর্তমানে মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে রয়েছেন। সম্প্রতি দৈনিক আমাদের মাতৃভূমির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে চাকরি লাভ, ঘুষ গ্রহণ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাহাড়সম তথ্য উন্মোচিত হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বাসিন্দারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। এই আঞ্চলিক পরিচয়ের অপব্যবহার করে অনেকেই বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনৈতিক উপায়ে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান তারা। টুঙ্গিপাড়ার শ্রীরামকান্দি গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবুল হোসেন ও কুলসুম বেগমের ছেলে শেখ জিকরুল আলমও এই বলয়ের অন্যতম সুবিধাভোগী।
২০১৩ সালে খাদ্য অধিদপ্তরের একটি বিতর্কিত নিয়োগ পরীক্ষায় রাজনৈতিক প্রভাবে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে যোগ দেন জিকরুল আলম। ওই নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রায় অর্ধশত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক খাতিরে তার প্রথম পোস্টিং হয়েছিল নিজ জেলা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। সেখানে দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠলে তাকে ফরিদপুর সদরে বদলি করা হয়। ফরিদপুর থেকে তার দুর্নীতির জাল আরও বিস্তৃত হয় এবং তিনি ঢাকা ও বাগেরহাটের মোল্লাহাটেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। বিশেষ করে ঢাকার এরিয়া রেশনিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খাদ্য গুদামে ধান-চাল ও গম সংগ্রহে ওজনে গরমিল, নিম্নমানের খাদ্যশস্য গ্রহণ এবং মিল মালিকদের হয়রানির মাধ্যমে তিনি অঢেল অর্থকড়ি কামাই করেন।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শাস্তি পাওয়ার পরিবর্তে উল্টো উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে মাদারীপুরে যোগদান করেন শেখ জিকরুল আলম। বিগত দিনে নিজেকে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য বলে পরিচয় দেওয়া এই কর্মকর্তা বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও বহাল তবিয়তে আছেন।
বর্তমানে শেখ জিকরুল আলমের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার অবৈধ সম্পদের সন্ধানে স্ত্রী তানিয়া ইসলাম, শ্বশুর আবুল হাসেম, শাশুড়ি রেশমা বেগম, তিন সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তথ্য চেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তদন্তে জানা গেছে, ঘুষ ও দুর্নীতির টাকায় রাজধানী ঢাকা এবং গোপালগঞ্জ সদর পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও জমি কিনেছেন তিনি। গোপালগঞ্জ পৌরসভার মিয়াপাড়া এজি মিশন রোডের শত নম্বর ডুপ্লেক্স বাড়িটিও তার অবৈধ আয়ে নির্মিত বলে জানা গেছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মাদারীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ জিকরুল আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খাদ্য অধিদপ্তর থেকে একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে এই কর্মকর্তার আরও অনেক লোমহর্ষক দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















