
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার একাধিক আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অপরাধ সিন্ডিকেট। ভুয়া গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দিয়ে নারী পাচার, মাদক ব্যবসা, অপহরণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই সাম্রাজ্য পরিচালনা করে আসছে সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ নামের এক ব্যক্তি—এমনটাই অভিযোগ উঠেছে অনুসন্ধানে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ক্ষমতার দাপট বজায় রাখতে সাজ্জাদ নিজেকে ডিবি সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতেন। এই পরিচয়ের আড়ালেই তিনি যাত্রাবাড়ীর হোটেল প্রজাপতি, হোটেল প্রাইম, হোটেল স্বাগতম, হোটেল রংধনু, হোটেল প্যারাডাইস, হোটেল হেভেন, হোটেল প্যালেস, হোটেল মুন, হোটেল রোজভিউ এবং ফেইস ইনের মতো অন্তত এক ডজন হোটেলের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা অসহায় ও দরিদ্র নারীদের ফাঁদে ফেলত এই চক্র। এক ভুক্তভোগী নারী জানান, গার্মেন্টসে চাকরির খোঁজে এসে সাজ্জাদের খপ্পরে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে তাঁকে একটি হোটেলে টানা তিন মাস আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হয়। কোনোমতে পালিয়ে পরবর্তীতে সৌদি আরবে গিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেন তিনি।
অপরাধ চক্রটির হাত কতটা বিস্তৃত, তা জানা যায় সেলিম নামের অপর এক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা থেকে। সাজ্জাদের অপরাধের প্রতিবাদ করতে এবং আইনি ব্যবস্থা নিতে যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়েছিলেন তিনি। তবে তাঁর অভিযোগ, অভিযোগ দায়েরের আগেই থানা থেকে তথ্য পৌঁছে যায় সাজ্জাদের কাছে। ওই রাতেই তাঁকে যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়ত এলাকা থেকে অপহরণ করে তিন দিন অনাহারে রেখে নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাজ্জাদ একা নন; এই অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনার নেপথ্যে আল-আমিন, তারামিয়া ও গণিসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের ‘মাসোহারা’ লেনদেন হতো। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাসোহারা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে আসামিদের বিরুদ্ধে কঠিন আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে:
ভুয়া পরিচয়: ডিবি পরিচয়ে প্রতারণার জন্য দণ্ডবিধির ১৭০ ধারায় বিচার হতে পারে।
মানব পাচার: মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ৫, ৬, ৭ ও ১১ ধারায় সংঘবদ্ধ পাচার ও জিম্মি করার দায়ে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে।
বেআইনি আটক ও মারধর: তিন বা তার বেশি দিন আটকে রাখা ও নির্যাতনের জন্য দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৪২ ও ৩৪৩ ধারায় অপরাধী সাব্যস্ত করা সম্ভব।
যাত্রাবাড়ী এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এবং এই চক্রের মূল উপড়ে ফেলতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও ডিএমপি সদর দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, হোটেলগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ, ট্রেড লাইসেন্স এবং অবৈধ লেনদেনের উৎস পরীক্ষা করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনলাইন ডেস্ক 
























