
প্রথম দর্শনে তাঁকে দেখলে একজন চৌকস ও নায়কোচিত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কর্মকর্তা বলে মনে হবে। কিন্তু পর্দার আড়ালে তাঁর ঘুষ, দুর্নীতি ও জাল দলিল বাণিজ্যের শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত। বলছি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুর নিবাসী, বর্তমানে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার (ডি.আর.) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বহুল আলোচিত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের কথা। যোগদানের পর থেকেই তিনি যেন একচ্ছত্র লুটপাট বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের অধীনে জেলা সদরসহ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২১টির মতো সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে। এসব অফিস থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার দলিল সম্পাদিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তাঁর বিশ্বস্ত সহকারীর মাধ্যমে মাস শেষে দলিলপ্রতি ২,৫০০ টাকা হারে ‘নাশতা খরচ’ বা উৎকোচ বাবদ প্রতি মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ ছাড়া প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়মিত ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের সিন্ডিকেট রয়েছে। ৫ হাজার টাকা ঘুষ না দিলে সাধারণ মানুষের দলিল বাতিলের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদপুষ্ট শফিকুল ইসলামের দুর্নীতির হাতেখড়ি হয় মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুর সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়। পরবর্তীতে তৎকালীন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে ম্যানেজ করে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে নাটোর জেলায় যোগদান করেন। এরপর থেকেই নামে-বেনামে গড়ে তুলতে শুরু করেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইজিআর অফিসের অনুমতি ছাড়াই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ১০ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন। সেখানেও তাঁর ছত্রছায়ায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দুর্নীতির মহোৎসব চলে, যা পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার নজরে আসে এবং দুদকের মামলা পর্যন্ত গড়ায়। তবে পর্দার অন্তরালে থেকে সুচতুর শফিকুল বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।
সর্বশেষ, নানা নাটকীয়তা ও তদবিরের মাধ্যমে তিনি ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন বাগিয়ে নেন। যদিও নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তালিকায় তাঁকে ফরিদপুর দেখানো হলেও, ৬ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুদকের অভিযানের সময় তিনি নিজেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন।
শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দাখিল করা হলেও রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে:
ঢাকা ও রাজধানী: কল্যাণপুরের ড্রিম হেভেন ভবনে (বাসা নম্বর-১২, রোড নম্বর-০২, ওয়ার্ড নম্বর-১১) বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং মোহাম্মদপুরে বাড়ি। এ ছাড়া তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামের নামে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৬১৬৬) রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা ও নিজ জেলা: চুয়াডাঙ্গা সদরের কাঠপট্টি এলাকায় চারতলা বাড়ি, কার্পাসডাঙ্গা বাজারে মার্কেটসহ চারতলা ভবন, আট কবর এলাকায় মার্কেটসহ দোতলা ভবন এবং নিজ গ্রাম জগন্নাথপুরে বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি।
অন্যান্য জেলা: যশোর ও ঝিনাইদহে একাধিক বাড়ি এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ জমি।
ব্যবসা ও বেনামি অ্যাকাউন্ট: ভাগিনা মো. হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে পরিচালিত কোটি টাকার ‘নেহা ত্বহা ট্রেডার্স’ এবং সংগোপনে একাধিক বেনামি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।
গত ৯ সেপ্টেম্বর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়র সাংবাদিক জিএম রফিকুল ইসলামের ওপর হামলা চালায় মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উমেদার আওলাদ ওরফে ব্লেট আওলাদ, পটু রাসেল, ইয়াবা রাসেল, কামাল ওরফে মাতাল কামাল ও ব্লেট রাজিবসহ একটি সিন্ডিকেট। চাঞ্চল্যকর এই হামলার ঘটনা ঘটলেও জেলা রেজিস্ট্রার শফিকুল ইসলাম অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি।
অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রক্রিয়া ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দুদকের একটি প্রভাবশালী অংশ এবং কতিপয় গণমাধ্যমকর্মীকে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করেছেন এই কর্মকর্তা। দলিল লেখক সমিতির এক শীর্ষ নেতার মতে, “প্রতি বৃহস্পতিবার অফিস শেষে তাঁর ও তাঁর সহকারীর সচল কার্যক্রম বা তল্লাশি চালালে দুদক এনফোর্সম্যান্টিম হাতেনাতে অবৈধ টাকাসহ তাঁকে ধরতে পারবে।”
গুরুতর সব অভিযোগ ও দুর্নীতির পাহাড় জমে থাকা সত্ত্বেও বহালতবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই কর্মকর্তার ‘খুঁটির জোর কোথায়’—তা নিয়ে এখন সচেতন নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীদের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে তাঁর অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অনলাইন ডেস্ক 

























