
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ষষ্ঠ একাডেমিক ভবন (দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ) নির্মাণকাজের ৭৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতিয়ে নিতে জালিয়াতি ও ভুয়া নথিপত্র ব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকার্য শুরু হয়েছে। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. মিজানুর রহমান এই চার্জগঠন বা বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৭৫ কোটি ১ লাখ ২৯৫ টাকার প্রাক্কলিত মূল্যে এই একাডেমিক ভবন নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে। এতে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান ‘জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড’ এবং ‘দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড’ যৌথভাবে অংশ নিয়ে কার্যাদেশ বাগিয়ে নেয় এবং ১৪ নভেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
তবে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দরপত্র আহ্বানের মাত্র একদিন পর—অর্থাৎ ২৯ আগস্ট—নতুন নিবন্ধিত হওয়া ওই কোম্পানির পক্ষে কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকায়, শামীমের আগের প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস জি কে বিল্ডার্স’-এর গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা, টার্নওভার ও লিকুইড অ্যাসেটের তথ্য জাল করে ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি, প্রকৃত আইনগত সত্তা গোপন এবং কৃত্রিমভাবে শেয়ারের হিসাব বাড়িয়ে মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করা হয়েছিল।
তৎকালীন সময়ে মাত্র দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই দরপত্রে সুযোগ করে দিতে সাধারণ ঠিকাদারদের ফরম ক্রয়ে বাধা দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ নামধারী দুটি পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও তাণ্ডবের ঘটনাও ঘটেছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে র্যাবের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে নিকেতন থেকে বিপুল অর্থ ও অস্ত্রসহ জি কে শামীম গ্রেপ্তার হলে এই জালিয়াতির অন্ধকার অধ্যায় প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে।
ঘটনার চার বছর পর ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর দুদক মামলা করে এবং দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৭ মে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ‘দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে জি কে শামীমই একমাত্র অভিযুক্ত।
দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪০৯ ধারায় এই মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হচ্ছে। জামিনে থাকা জি কে শামীম আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর এই মামলার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে।
সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের জালিয়াতি তৎকালীন প্রশাসন ও মূল্যায়ন কমিটির চরম উদাসীনতা ও নজরদারির ঘাটতি প্রমাণ করে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সাক্ষ্যগ্রহণ ও আদালতের চূড়ান্ত রায় ভবিষ্যতে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধে একটি মাইলফলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন বিশ্লষকরা।
অনলাইন ডেস্ক 

























