
নথিপত্র অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি আর্থিক বিধিমালা এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে বেয়ারার চেকে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে এই অর্থ লোপাট করা হয়েছে। আর এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিটি পদক্ষেপে সরাসরি স্বাক্ষর ও অনুমোদন ছিল তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) মো. দিলদার হোসেনের—যিনি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে উন্নয়ন-১ শাখা তে উপসচিব পদে নিয়োজিত রয়েছেন। আর এই সিন্ডিকেটের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর তৎকালীন মহাপরিচালক ডক্টর বিনায়েক সেন (বর্তমানে বিদেশে), বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর তৎকালীন সিনিয়ার রিসার্স ফেলো ড. মোহাম্মদ ইউনুস (বর্তমানে গবেষণা পরিচালক), এবং রিসার্স ফেলো ডক্টর এস এম জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী ( বর্তমানে পরলোকগত)।
সরকারি আর্থিক নির্দেশিকা অনুযায়ী সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত যেকোনো লেনদেনে ক্রসড বা ‘অ্যাকাউন্ট পে’ চেকে অর্থ পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক, যাতে অর্থের সঠিক গন্তব্য ও অডিট ট্রেইল সুরক্ষিত থাকে। তবে জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১ প্রকল্পে এই নিয়মের তোয়াক্কা করা হয়নি। অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় বিআইডিএস-সংক্রান্ত হিসাব (নম্বর: ০২০০০১৯২১৫২৯০) থেকে নিয়মের বাইরে গিয়ে বেয়ারার চেকের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক কাউন্টার থেকে নগদ টাকা তোলার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে:
১৫ নভেম্বর ২০২২: ৫০৫৩০০৮ নম্বর চেকে নগদ ৯৮ লাখ ৭৪ হাজার ১০০ টাকা উত্তোলন করা হয়।
৭ মার্চ ২০২৩: ৫০৫৩০২০ নম্বর চেকে এক কিস্তিতে নগদ ২০ লাখ টাকা তোলা হয়।
৪ এপ্রিল ২০২৩: ৫০৫৩০২৬ নম্বর চেকে নগদ ৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা তোলা হয়।
অডিট বিশেষজ্ঞদের মতে, হিসাবের কাগুজে প্রমাণ বা ‘অডিট ট্রেইল’এড়ানোর অসদুদ্দেশ্যেই এ ধরনের বেয়ারার চেক ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যাংকের একটি অসাধু চক্রের যোগসাজশে এসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
শুমারি-পরবর্তী যাচাই জরিপ (PEC) ও ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজে যুক্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানী ও পারিতোষিকের নথিতেও ব্যাপক গরমিল পাওয়া গেছে। বিবিএসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্মানী গ্রহণের নথির স্বাক্ষরের সঙ্গে ব্যাংকের চেক ও প্রাপ্তি স্বীকার নথির স্বাক্ষরে স্পষ্ট অমিল রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইদুর রহমান এবং সহকারী কার্টোগ্রাফার মো. জাহাঙ্গীর আলমের নাম ও স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মাঠপর্যায়ের ভুক্তভোগী কর্মীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁরা সততার সঙ্গে জরিপ ও ডেটা প্রসেসিংয়ের কাজ সম্পন্ন করলেও তাঁদের নামে বরাদ্দ সম্মানীর বড় অংশই তাঁদের হাতে পৌঁছায়নি। কারও অজান্তেই নথিতে স্বাক্ষর বসিয়ে পুরো অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে অথবা নামমাত্র কিছু অর্থ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের ভেতরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, পিইসি জরিপের অনিয়ম কেবল পুরো চিত্রটির একটি ছোট অংশ মাত্র। মূল প্রকল্পের বাজেট থেকে চারটি বড় খাতে প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে:
১. ট্যাব কেনা: মাঠপর্যায়ে ব্যবহারের জন্য কেনা প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার ট্যাবলেট কম্পিউটারের ক্রয়ে সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগসাজশে বাজারদরের চেয়ে বহুগুণ বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে।
২. প্রশিক্ষণ খাত: কাগজে-কলমে কাল্পনিক কর্মশালা, ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী এবং অতিরিক্ত ভেন্যু ভাড়া দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
৩. প্রচার-প্রচারণা: শুমারির প্রচারের নামে এমন সব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিল পাস করা হয়েছে, বাস্তব ক্ষেত্রে যাদের কোনো মিডিয়া তালিকাভুক্তি বা অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
৪. জ্বালানি ও পরিবহন: সরকারি গাড়ির অফিশিয়াল লগবুক এবং ফিলিং স্টেশনের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের বিলের কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং বিল পাসের মূল দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক (উপসচিব) মো. দিলদার হোসেন। দাপ্তরিক নথি, ক্যাশ স্মারক ও ব্যাংকের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিটি বেয়ারার চেক এবং ভুয়া বিলে তাঁর সরাসরি স্বাক্ষর ও অনুমোদন রয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বিবিএসের একটি দুর্নীতিবাজ চক্র, বিআইডিএসের কিছু কর্মকর্তা এবং অগ্রণী ব্যাংকের একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই বিশাল দুর্নীতি কাণ্ড ঘটিয়েছেন।
প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘন করে কেন ‘অ্যাকাউন্ট পে’চেক বাদ দিয়ে বাহকের মাধ্যমে নগদ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলো—তা নিয়ে এখন প্রশাসনের অন্দরেও তীব্র আলোচনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। জনস্বার্থে এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রতিটি দুর্নীতিবাজ ও তাদের দোসরদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
এই জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চেয়ে ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের সঙ্গে citypostbd.com এর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘এটা পদ্ধতিগত ভুল ছিল। পরবর্তীতে ইকোনমিক শুমারিতে এই ভুল আর করেনি। পিপিআর বিধিমালা লঙগন করে অর্থ ব্যয় দেখানো অর্থ তসরুপ করা কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে, ‘‘বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গিয়ে এলোমেলো উত্তর দেন’’।
তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন‘‘ আমি থাইল্যান্ড আছি ভাই,, আপনার ব্যক্তিগত নাম্বার দেন। দেশে এসে যোগাযোগ করবো।’’
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























